এই লেখায়
অনেক অনলাইন সেলারের গল্প একই রকম: অর্ডার আসছে, পার্সেল যাচ্ছে, সারাদিন ব্যস্ত, কিন্তু মাস শেষে হাতে টাকা নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমস্যাটা বিক্রিতে না, প্রোডাক্টের দাম নির্ধারণে। কেনা দামের ওপর কিছু টাকা বসিয়ে দাম ঠিক করলে ডেলিভারি, COD চার্জ, অ্যাড আর রিটার্নের খরচ চুপচাপ লাভ খেয়ে ফেলে।
এই লেখায় ধাপে ধাপে দেখব প্রতি অর্ডারের আসল খরচ কীভাবে বের করবেন, টাকার উদাহরণসহ লাভের হিসাব, আর কোন কৌশলে দাম ঠিক করলে কাস্টমারও খুশি থাকেন, আপনারও লাভ থাকে।
প্রতি অর্ডারের আসল খরচ কী কী
দাম ঠিক করার আগে একটা অর্ডারে মোট কত খরচ হয়, সেটা আলাদা আলাদা লিখুন:
- কেনা দাম: পাইকারি দাম, সাথে মাল আনার যাতায়াত বা পরিবহন খরচ।
- প্যাকেজিং: পলি, বক্স, টেপ, স্টিকার, ধন্যবাদ কার্ড।
- ডেলিভারি খরচ: কুরিয়ার আপনার কাছ থেকে যা নেয়। কাস্টমার যদি পুরো ডেলিভারি চার্জ দেন, তাহলে এটা প্রায় শূন্য। ফ্রি বা কম চার্জে দিলে বাকিটা আপনার।
- COD চার্জ: অনেক কুরিয়ার কালেক্ট করা টাকার ওপর একটা চার্জ রাখে। রেট কুরিয়ারভেদে আলাদা, তাই বর্তমান রেট আপনার কুরিয়ারের কাছ থেকে জেনে নিন।
- অ্যাড খরচ: বুস্ট বা অ্যাডে মোট খরচ ভাগ ডেলিভারড অর্ডার।
- রিটার্নের খরচ: কিছু পার্সেল ফেরত আসবেই। সেই ক্ষতি সফল অর্ডারগুলোর ওপর ভাগ করে ধরতে হয়।
- অন্যান্য: মোবাইল ডাটা, কনফার্মেশন কলের খরচ, bKash বা Nagad-এ ক্যাশ আউট চার্জ ইত্যাদি।
রিটার্ন আর অ্যাড খরচ প্রতি অর্ডারে কীভাবে ভাগ করবেন
এই দুইটা খরচই সবচেয়ে বেশি ভুলে যাওয়া হয়।
অ্যাড খরচ
ধরুন এক মাসে বুস্টে খরচ করলেন ৳3,000, আর সেই অ্যাড থেকে ডেলিভারড অর্ডার হলো 20টা। তাহলে প্রতি অর্ডারে অ্যাড খরচ ৳3,000 ÷ 20 = ৳150। খেয়াল করুন, মেসেজ বা অর্ডারের সংখ্যা দিয়ে না, ডেলিভারড অর্ডার দিয়ে ভাগ করুন, কারণ রিটার্ন হওয়া অর্ডার থেকে টাকা আসে না।
রিটার্ন খরচ
ধরুন প্রতি 10টা পার্সেলের 1টা ফেরত আসে। একটা রিটার্নে আপনার ক্ষতি হতে পারে:
- পাঠানোর ডেলিভারি চার্জ, ধরুন ৳70
- রিটার্ন চার্জ, ধরুন ৳50 (আপনার কুরিয়ারের রেট দেখুন)
- নষ্ট হওয়া প্যাকেজিং ৳30
মোট প্রায় ৳150। এই ক্ষতি বাকি 9টা সফল অর্ডারে ভাগ করলে প্রতি অর্ডারে প্রায় ৳17। সাথে প্রোডাক্ট নষ্ট হওয়া বা পুরনো হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি ধরে হিসাবটা গোল করে ৳40 ধরলে নিরাপদ।
আপনার কুরিয়ারের রেট বসিয়ে এই হিসাব করতে ডেলিভারি চার্জ ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে পারেন। সেখানে ঢাকার ভেতরে-বাইরে চার্জ, COD চার্জ আর রিটার্নের হিসাব একসাথে বসানো যায়।
টাকার উদাহরণ: একটা থ্রি-পিসের দাম ঠিক করা
ধরুন একটা থ্রি-পিস আপনি কিনলেন ৳1,100 দিয়ে। কাস্টমার ঢাকার ভেতরে ৳70 ডেলিভারি চার্জ দেন, আর কুরিয়ারও আপনার কাছ থেকে ৳70 নেয়, তাই ডেলিভারিতে আপনার বাড়তি খরচ নেই। COD চার্জ ধরলাম কালেক্ট করা টাকার 1% (উদাহরণ)। এখন তিনটা ভিন্ন দামে লাভ কেমন দাঁড়ায় দেখুন:
| খরচ ও লাভ | দাম ৳1,450 | দাম ৳1,650 | দাম ৳1,850 |
|---|---|---|---|
| কেনা দাম | ৳1,100 | ৳1,100 | ৳1,100 |
| প্যাকেজিং | ৳30 | ৳30 | ৳30 |
| অ্যাড খরচ (প্রতি অর্ডার) | ৳150 | ৳150 | ৳150 |
| রিটার্নের জন্য রাখা | ৳40 | ৳40 | ৳40 |
| COD চার্জ (প্রায় 1%) | ৳15 | ৳17 | ৳19 |
| মোট খরচ | ৳1,335 | ৳1,337 | ৳1,339 |
| প্রতি অর্ডারে লাভ | ৳115 | ৳313 | ৳511 |
| লাভের হার (দামের তুলনায়) | প্রায় 8% | প্রায় 19% | প্রায় 28% |
এখান থেকে তিনটা জিনিস পরিষ্কার:
- ৳1,450-তে বিক্রি করলে দেখতে "৳350 লাভ" মনে হয়, কিন্তু আসল লাভ মাত্র ৳115। দুইটা রিটার্নেই সেটা শেষ।
- কেনা দামের ওপর ৳550 বসালে (৳1,650) সব খরচ বাদেও প্রতি অর্ডারে ৳300-এর বেশি থাকে।
- অ্যাড খরচ একটু বাড়লেই কম দামের অপশন লোকসানে চলে যায়। তাই কম দামে বিক্রি করলে অ্যাড খরচের দিকে কড়া নজর রাখতে হয়।
ঢাকার বাইরে ফ্রি ডেলিভারি দিলে
এখন ধরুন একই থ্রি-পিস ৳1,650-তে বিক্রি করছেন, কিন্তু ঢাকার বাইরে ফ্রি ডেলিভারি দিলেন, আর কুরিয়ার নিচ্ছে ৳130। তাহলে লাভ ৳313 থেকে কমে প্রায় ৳183। ফ্রি ডেলিভারি দিতে চাইলে দামটা একটু বাড়িয়ে নিন, নয়তো শুধু দুইটা বা তার বেশি প্রোডাক্ট কিনলে দিন।
নিজের সংখ্যা বসিয়ে এই হিসাব কয়েক সেকেন্ডে করতে ফ্রি প্রফিট ক্যালকুলেটর ব্যবহার করুন।
সর্বনিম্ন দাম কীভাবে বের করবেন
প্রতিটা প্রোডাক্টের জন্য একটা "এর নিচে বিক্রি করব না" দাম ঠিক করে রাখুন:
- প্রতি অর্ডারের সব খরচ যোগ করুন (উপরের মতো)।
- প্রতি অর্ডারে ন্যূনতম কত টাকা লাভ চান, সেটা যোগ করুন। যেমন ৳200।
- যোগফলটাই আপনার সর্বনিম্ন দাম। উদাহরণে ৳1,337 + ৳200 = প্রায় ৳1,540।
সেল, ডিসকাউন্ট বা দরদামের সময় এই দামের নিচে নামবেন না। কাস্টমার বেশি দরদাম করলে বিনয়ের সাথে না বলুন, অথবা ফ্রি গিফটের মতো কম খরচের কিছু অফার করুন।
দাম ঠিক করার কৌশল
শুধু খরচ দিয়ে না, বাজার আর কাস্টমারের মন বুঝেও দাম ঠিক করুন:
- বাজার দেখুন। একই ধরনের প্রোডাক্ট অন্য পেজে কত দামে বিক্রি হচ্ছে দেখুন, কিন্তু অন্ধভাবে কপি করবেন না। তাদের খরচ আর আপনার খরচ এক না।
- ৯-এ শেষ দাম। ৳1,000-এর বদলে ৳990 বা ৳1,650-এর বদলে ৳1,590 কাস্টমারের কাছে কম মনে হয়। অনেক পেজ এই কৌশল ব্যবহার করে।
- আগের দাম দেখান। অফার চললে আগের দাম কেটে নতুন দাম দেখান, যেমন "আগে ৳1,950, এখন ৳1,650"। তবে আগের দাম সত্যি হতে হবে, বানানো না। EasyMall-এ প্রতিটা প্রোডাক্টে "compare at" দাম বসানো যায়।
- বান্ডেল অফার। "দুইটা থ্রি-পিস ৳3,100, ডেলিভারি ফ্রি"। এতে প্রতি অর্ডারে অ্যাড আর ডেলিভারি খরচ দুইটা প্রোডাক্টে ভাগ হয়, লাভের হার বাড়ে।
- ফ্রি ডেলিভারির সীমা। আপনার গড় অর্ডার ৳1,200 হলে ৳2,000-এর বেশি অর্ডারে ফ্রি ডেলিভারি দিন।
- দাম লুকাবেন না। "দাম ইনবক্সে" লিখলে অনেক কাস্টমার মেসেজই করেন না। পরিষ্কার দাম বিশ্বাস বাড়ায়।
কখন দাম বদলাবেন
দাম বদলালে পুরনো কাস্টমারকে সংক্ষেপে কারণটা জানাতে পারেন, যেমন "পাইকারি দাম বেড়ে যাওয়ায় নতুন দাম"। সৎভাবে বললে বেশিরভাগ কাস্টমার বোঝেন।
দাম একবার ঠিক করে ভুলে যাবেন না। প্রতি মাসে একবার হিসাবটা আবার করুন, বিশেষ করে যখন:
- পাইকারি দাম বেড়েছে বা কমেছে।
- কুরিয়ার চার্জ বা COD চার্জ বদলেছে।
- অ্যাডে প্রতি অর্ডারের খরচ বেড়ে গেছে।
- রিটার্নের হার হঠাৎ বেড়েছে।
- ঈদ বা পূজার মতো মৌসুমে চাহিদা বেশি, আবার মৌসুম শেষে পুরনো স্টক বের করতে হবে।
যে ভুলগুলো এড়াবেন
দাম নিয়ে ভুল সাধারণত চোখে পড়ে মাস শেষে, যখন অর্ডার অনেক অথচ টাকা কম। সবচেয়ে সাধারণ ভুলগুলো:
- শুধু "কেনা দাম + কিছু টাকা" দিয়ে দাম ঠিক করা।
- অ্যাড খরচকে "আলাদা খরচ" ভেবে প্রোডাক্টের হিসাবে না ধরা।
- রিটার্নের ক্ষতি হিসাবে না রাখা।
- প্রতিযোগীর সাথে দামের যুদ্ধে নেমে লোকসানে বিক্রি করা।
- পেজে এক দাম, ওয়েবসাইটে আরেক দাম রাখা।
শেষ কথা
সঠিক দাম মানে সবচেয়ে কম দাম না, এমন দাম যেখানে সব খরচ বাদেও প্রতিটা অর্ডারে লাভ থাকে। একবার প্রতিটা প্রোডাক্টের হিসাব করে নিলে সেল, অফার আর অ্যাডের সিদ্ধান্তও অনেক সহজ হয়ে যায়। দাম ঠিক হয়ে গেলে EasyMall-এ ফ্রি স্টোর খুলে অফার দাম, স্টক আর ঢাকার ভেতরে-বাইরে ডেলিভারি চার্জসহ প্রোডাক্ট তুলে দিন, কোনো কার্ড বা bKash ছাড়াই এখানে শুরু করুন।
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
অনলাইন শপে কত শতাংশ লাভ রাখা উচিত?
এর কোনো একটা নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। প্রোডাক্টের ধরন, প্রতিযোগিতা আর অ্যাড খরচের ওপর নির্ভর করে। গুরুত্বপূর্ণ হলো সব খরচ, মানে ডেলিভারি, COD চার্জ, অ্যাড আর রিটার্ন বাদ দিয়ে প্রতি অর্ডারে আসলে কত থাকছে, সেটা জানা।
অ্যাড খরচ প্রতি অর্ডারে কীভাবে হিসাব করব?
এক মাসে বা একটা ক্যাম্পেইনে মোট যত টাকা অ্যাডে খরচ করেছেন, সেটাকে সেই সময়ে ডেলিভারড অর্ডারের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করুন। যেমন ৳3,000 খরচে 20টা ডেলিভারড অর্ডার হলে প্রতি অর্ডারে অ্যাড খরচ ৳150।
ফ্রি ডেলিভারি দিলে কি লাভ কমে যায়?
হ্যাঁ, ডেলিভারির খরচ তখন আপনাকে বহন করতে হয়। তাই ফ্রি ডেলিভারি দিলে হয় সেই খরচ দামের মধ্যে ধরুন, নয়তো একটা নির্দিষ্ট টাকার বেশি অর্ডারে দিন, যাতে কাস্টমার বেশি কেনেন।
প্রতিযোগীর চেয়ে কম দাম রাখলেই কি বিক্রি বাড়বে?
সবসময় না। খুব কম দামে লাভ এত কমে যায় যে একটা রিটার্নেই কয়েকটা অর্ডারের লাভ চলে যায়। ভালো ছবি, দ্রুত উত্তর, বিশ্বস্ত ডেলিভারি আর পরিষ্কার পলিসি দিয়ে একটু বেশি দামেও বিক্রি করা যায়।
দামের হিসাব সহজে করার কোনো টুল আছে?
EasyMall-এর ফ্রি প্রফিট ক্যালকুলেটরে কেনা দাম, ডেলিভারি, COD চার্জ আর অ্যাড খরচ বসালে বিক্রির দাম আর লাভের হার দেখা যায়। ডেলিভারি চার্জের জন্য আলাদা ক্যালকুলেটরও আছে।
আজই আপনার অনলাইন শপ শুরু করুন
নিজের স্টোর ওয়েবসাইট, ক্যাশ অন ডেলিভারি চেকআউট, অর্ডার ম্যানেজমেন্ট আর বাংলায় উত্তর দেওয়া AI অ্যাসিস্ট্যান্ট। সারাজীবন ফ্রি, কোনো পেমেন্ট লাগবে না।
ফ্রি স্টোর খুলুন